ফাঁসি হওয়া রাষ্ট্রনায়কের কাহিনী

আজ এমন একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্মদিন, যাঁর ফাঁসির ১৪ বছর পরেও তাঁকে ঘিরে নানান গল্প ও মিথ কুয়াশার মতো বিছিয়ে রয়েছে আজও; হ্যাঁ আপনারা হয়ত ঠিকই আন্দাজ করেছেন, আমি ২৪ বছর ইরাকের সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার সামলানো সাদ্দাম হোসেন আবদুল মাজিদ আল তিকরিতি-র কথাই বলছি, যাঁকে সারা দুনিয়া চেনে সাদ্দাম হোসেন নামে। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই মানুষটির কথা যিনি ‘পাশ্চাত্য এবং অনেক ইরাকির চোখে নিষ্ঠুর একনায়ক আর ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, আবার অনেকের কাছে যিনি ছিলেন ‘মসিহা’।

     

ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাদ্দাম হোসেন

২৮ এপ্রিল ১৯৩৭-সাদ্দামের জন্ম ইরাকের প্রধান শহর বাগদাদ থেকে বেশ কয়েকশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তিরকিত শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল-আওজা গ্রামে। জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা যান। মা, সুবহা তুলফা আল মুসসালাত পুনরায় বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হ’ন। সৎ বাবার পরিবারে তিনি বড় হতে চাননি, তাই পালিয়ে চাচা কাইরাল্লাহ তুলফা সঙ্গে বাগদাদে বসবাস করতে শুরু করেন। সেখান থেকেই বা'থ পার্টির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ।

১৯৩২ সালে ইরাক ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেলেও তাঁর তেলের খনিগুলির মায়া ব্রিটেন তখনও অব্দি ছাড়তে পারেনি। ১৯৫৮ সালে একটি সেনা বিদ্রোহের পর ইরাক পুরোপুরিভাবে স্বাধীনতা লাভ করে। কৈশোর থেকে সাদ্দামের ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতা তাঁকে আরও রাজনীতি অভিমুখী করে তুলেছিল। সেই মুহূর্ত থেকেই ইরাকের শাসকের গদি ছিল টালমাটাল কারণ বা'থ পার্টি, তৎকালীন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেমকে হত্যার পরিকল্পনায় লেগে পড়েছে। ২০ বছর বয়সী সাদ্দাম বাথ পার্টির হয়ে পুরো পরিকল্পনায় ছিলেন অগ্রভাগে জড়িত।

বা'থ পার্টি, আবুল কাশেমের হত্যাকাণ্ডে অসফল হলে সাদ্দাম পালিয়ে যান ইজিপ্টে সেখানে গিয়ে তিনি তাঁর আইনবিদ্যার পাঠ শেষ করেন। ঠিক ৪ বছর পর ১৯৬৩ সালে বাথ পার্টি, কাসেমকে উৎখাত করলে সাদ্দাম ফিরে আসেন এবং নতুন করে শুরু হয় তাঁর যাত্রা। ১৯৬৮ সালে সাদ্দাম পুরোপুরিভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি হন হাসান আল বাক্কার এবং উপরাষ্ট্রপতির গদি দখল করে নেন সাদ্দাম হোসেন। পরবর্তী প্রায় ১০ বছর বাক্কার আর সাদ্দামের যুগলবন্দী ইরাককে বেশ উন্নতির পথে নিয়ে যায়। সেই সময়ে সাদ্দাম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতির ভূমিকায় থাকলেও রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্তের মূলে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা।

১২ বছর পরে সাদ্দাম অসুস্থ বাক্কারকে সরিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি হন। ইরাকে শুরু হয় একটি নতুন যুগ। ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই সাদ্দাম 'এমন এক নীতি গ্রহণ করেন যার ফলে, কোন উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর কাজকর্মে যদি সামান্যতম বিদ্বেষী মনোভাবের গন্ধ পেতেন তাহলে নিমেষে তিনি তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এই সময়কালেই বিরোধী ধর্মীয় সংগঠন শিয়া এবং রাজনৈতিক সংগঠন কুর্দ, তাঁকে গদিচ্যুত করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে সময়ে সময়ে প্রচুর বিপ্লব এবং বিপ্লবীদের আবির্ভাব ঘটতে থাকে। 

১৯৭৮-৭৯ সালে পাশের দেশ ইরানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ এর শাসন নীতির প্রতিবাদে ছাত্র দ্বারা পরিচালিত একটি আন্দোলনে ইরানের রাজতন্ত্র ভেঙে পড়ে এবং শাসক হিসাবে উঠে আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনী। খোমেনীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইরান সহ তার আশেপাশের দেশগুলিতে যেন পূর্ণরূপে শিয়া ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ইরাক ছিল শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। ১৯৮০-৮২ সালের মধ্যে ইরাক এবং ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। ইরাকের হয়ে গোপনে পক্ষপাতিত্ব করে ২-টি অতিকায় রাষ্ট্রশক্তি- আমেরিকা ও সোভিয়েত। যুদ্ধে ৩ রাষ্ট্রের মুখে পড়ে ইরান একেবারে কোণঠাসা হয়ে যায়। যুদ্ধের শেষের দিকে সাদ্দাম কুর্দিস্তানের সাথে তাঁর পুরোনো শত্রুতার প্রতিশোধে রাসায়নিক এবং জৈব অস্ত্রের ব্যবহার করেন। কুর্দিস্তানে অবস্থিত প্রায় ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে মৃত্যু হয় ১.৮ লক্ষ মানুষের।

পরবর্তী ঘটনা হল গালফ ওয়ার। সোভিয়েতের পতন নিশ্চিত হয়ে গেলে অবসান হয় ঠাণ্ডা যুদ্ধের, বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে আসে বড়সড় বদল। তেলের খনি নিয়ে কুয়েত এবং ইরাকের মধ্যে শুরু হয় অর্থনীতির লড়াই। এই আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে সাদ্দাম কুয়েতকে নিজ অধিগ্রহণের আওতায় এনে সেখানকার তেলের খনিগুলির নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ১৯৯০-এর অগাস্ট মাসে কুয়েত আক্রমণ করেন এবং দুই দিনের মধ্যেই তিনি গোটা দেশ দখল করে নেন। এই ঘটনায় সৌদি আরব ছুটে যায় বন্ধুরাষ্ট্র আমেরিকার কাছে। আমেরিকা ৩৫-টি দেশ নিয়ে একটি জোট তৈরি করে যারা সকলেই এককালের বন্ধুরাষ্ট্র ইরাকের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। আমেরিকার লাগাতার হামলায় প্রায় ১০০ ঘণ্টার মধ্যেই ইরাক পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে এবং ২৮-শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ স্থগিত হয়। এই অবস্থায় ইরাকি সৈন্য ধীরে ধীরে কুয়েত থেকে পিছু হটতে থাকে কিন্তু কুয়েতের মাটিতে তাদের পদচিহ্ন রেখে যেতে ভোলে না। ফেরার পথে প্রায় ৮০০ তেলের খনি জ্বালিয়ে দেয়।

যুদ্ধ শেষে আমেরিকা একটি নতুন ফন্দী আঁটে। কুর্দ ও শিয়া গোষ্ঠীকে ইরাকের পেছনে লেলিয়ে দেয়। আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল যাতে এই দুই গোষ্ঠীর মিলিত সংগ্রামে সাদ্দাম গদিচ্যুত হয়ে যায়। কিন্তু দুই গোষ্ঠীকেই সাদ্দামের সৈন্যদল দুমড়ে-মুচড়ে রেখে দেয়। গালফের যুদ্ধে ইরাক হারায় তার ৩০ হাজার সৈন্যকে এবং এই যুদ্ধের পরই ইরাকের শাসনব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে।

তৃতীয় দফায় শুরু হয় 'অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম'। গালফ যুদ্ধের শেষের দিকে সাদ্দাম হোসেন চুক্তিবদ্ধ হন যে তিনি কোন রকম পারমাণবিক, রাসায়নিক এবং জৈবিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করতে পারবেন না। ৯/১১ ঘটনার পরে আমেরিকা সাদ্দাম হোসেনকে পুরোপুরিভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। সাদ্দামসহ ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে ইরাক এখনও ডব্লিউ এম ডি (উইপন্স অফ মাস ডেস্ট্রাকশন) তৈরি করে চলেছে। ততদিনে রাষ্ট্রসংঘও 'উইপন্স অফ মাস ডেস্ট্রাকশন' তৈরিতে বেশকিছু নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ম-নীতি লাগু করে ফেলেছে।

২০০৩ সালের মার্চ মাস থেকে আমেরিকা ইরাকে আক্রমণ হানে ইউকে, অস্ট্রেলিয়া এবং পোল্যাণ্ড-কে সাথে নিয়ে। আমেরিকান সৈন্যরা মাত্র ৩ সপ্তাহের মধ্যেই ইরাকের বড় শহরগুলি নিজেদের দখলে নিয়ে চলে আসে। সাদ্দাম সবার অলক্ষ্যে পালিয়ে যান নিজের জন্মস্থান তিরকিতে এবং সেই বছরেরই ১৩-ই ডিসেম্বর সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করে আমেরিকান সৈন্যরা। প্রায় ৩ বছরের মাথায় ২০০৬ সালের ৫-ই নভেম্বর সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয় এবং সে বছরেরই ৩০-শে ডিসেম্বর তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়। মানব অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাদ্দামের মৃত্যুর দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দী করে দেখানো হয় গোটা দুনিয়ার মানুষকে। তবে ফাঁসির রশিতে ঝোলানোর আগ পর্যন্ত তাঁর মনোবল ছিল অটুট। ছিল না কোনো অনুশোচনা। মৃত্যুর ২ দিন পূর্বে সাদ্দাম দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে জানান ইরাকের মানুষ যেন বলপূর্বক ইরাকে প্রবেশকারী দেশগুলিকে  ক্ষমা না করে।

ফাঁসির মঞ্চে সাদ্দাম

যে জৈবরাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র মজুত রাখার অজুহাত দেখিয়ে ইরাকের মাটিতে সৈন্য প্রবেশ করল এবং সাদ্দাম গ্রেফতার হলেন তার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না, প্রমাণও মিলল না। কিন্তু সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড হল এবং তা হল কোন সংঘটিত বিচার ব্যবস্থা ছাড়াই।

২০০৩-এর ডিসেম্বর গ্রেফতার হওয়া থেকে ২০০৬-এর ডিসেম্বরে তাঁর ফাঁসির দিন অবধি সাদ্দামকে পাহারা দিয়েছিলেন ১২ জন মার্কিন সৈন্য, যাঁরা সকলেই সাদ্দামের শেষ সময়ের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। মার্কিন ৫৫১ নম্বর মিলিটারি পুলিশ কোম্পানির ওই ১২ জন সেনাসদস্যকে 'সুপার টুয়েলভ' বলে ডাকা হতো। তাঁদেরই একজন, ‘উইল বার্ডেনওয়ার্পার’ একটি বই লিখেছেন, 'দা প্রিজনার ইন হিজ প্যালেস, হিজ অ্যামেরিকান গার্ডস, অ্যান্ড হোয়াট হিস্ট্রি লেফট আনসেইড' নামে। বাংলা করলে বইটির নাম হতে পারে 'নিজের প্রাসাদেই এক বন্দী, তাঁর আমেরিকান প্রহরী এবং ইতিহাস যে কথা বলেনি'।

বইটি জুড়ে রয়েছে সাদ্দাম হোসেনকে তাঁর শেষ সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা। বার্ডেনওয়ার্পার স্বীকার করেছেন যে তাঁরা যখন সাদ্দাম হোসেনকে জল্লাদদের হাতে তুলে দিলেন ফাঁসির জন্য, তখন তাঁদের ১২ জনেরই চোখে জল এসে গিয়েছিল।

বার্ডেনওয়ার্পারের লেখা থেকে জানা যায়, ইরাকের জেলে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটানোর সময়ে সাদ্দাম হোসেন আমেরিকান গায়িকা মেরি জে ব্লাইজার গান শুনতেন নিয়মিত। মিষ্টি খেতে খুব ভালবাসতেন। মাঝেমধ্যেই মাফিন খেতে চাইতেন। বার্ডেনওয়ার্পার লিখেছেন, নিজের জীবনের শেষ দিনগুলোতে সাদ্দাম তাঁদের সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করতেন। ওই ব্যবহার দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন যে, এই মানুষ একজন অত্যন্ত নিষ্ঠুর শাসক ছিলেন।

সাদ্দাম হোসেনের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত আমেরিকান সেনারাই তাঁকে একদিন জানিয়েছিলেন যে তাঁর ভাই মারা গেছেন। যে সেনাসদস্য খবরটা দিয়েছিলেন, সাদ্দাম তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, "আজ থেকে তুমিই আমার ভাই।" আরেকজন প্রহরীকে বলেছিলেন, "যদি আমার সম্পত্তি ব্যবহার করার অনুমতি পাই, তাহলে তোমার ছেলের কলেজে পড়তে যা খরচ লাগবে, সব আমি দিতে রাজী।" এক রাতে বছর কুড়ি বয়সের সেনা প্রহরী ডসন বাজে মাপে কাটা একটা স্যুট পড়ে ঘুরছিল। জানা গেল যে ডসনকে ওই স্যুটটা সাদ্দাম উপহার হিসাবে দিয়েছেন।

বার্ডেনওয়ার্পারের বইটাতে সবথেকে আশ্চর্যজনক যে বিষয়টার উল্লেখ রয়েছে, সেটা হল সাদ্দামের মৃত্যুর পরে তাঁর প্রহরীরা রীতিমতো শোক পালন করেছিলেন, যদিও তিনি আমেরিকার কট্টর শত্রু ছিলেন। প্রহরীদেরই একজন, অ্যাডাম রজারসন উইল বার্ডেনওয়ার্পারকে বলেছিলেন, "সাদ্দামের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরে আমার মনে হচ্ছে আমরা ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। নিজেদেরই এখন তাঁর হত্যাকারী বলে মনে হচ্ছে। এমন একজনকে মেরে ফেললাম আমরা, তিনি যেন আমাদের খুব আপনজন ছিলেন।"

তাঁর মৃত্যুর প্রায় ১৪ বছর পরেও বলা যাচ্ছে না, তাঁকে রাষ্ট্রনেতা হিসাবে ভালো এবং মন্দের সংজ্ঞায় কোন্ দলের উদাহরণ হিসাবে ধরা উচিত।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

Comments